মৃত্যুর পরে কী ঘটে? মানুষের চেতনা কি সত্যিই শেষ হয়ে যায়, নাকি অন্য কোনও স্তরে তার অস্তিত্ব থেকে যায়? যুগের পর যুগ ধরে এই প্রশ্ন ঘিরে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। এবার সেই বিতর্কেই নতুন করে আলোড়ন ফেলেছেন নাসার সঙ্গে কাজ করা প্রাক্তন সমুদ্রবিজ্ঞানী ইনগ্রিড হনকালা। তাঁর দাবি, জীবনে তিন বার মৃত্যুর খুব কাছাকাছি পৌঁছে তিনি এমন এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন, যা তাঁর জীবন ও বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণাই বদলে দিয়েছে।
৫৫ বছর বয়সি ইনগ্রিড জানান, প্রতিবারই তিনি এমন এক অবস্থায় প্রবেশ করেছিলেন যেখানে শরীরের সীমাবদ্ধতা যেন আর ছিল না। সেখানে ছিল না ভয়, আতঙ্ক কিংবা সময়ের কোনও অনুভূতি। বরং তিনি অনুভব করেছিলেন গভীর শান্তি, উজ্জ্বল স্বচ্ছতা এবং এক বিশাল আন্তঃসংযুক্ত চেতনার উপস্থিতি। তাঁর দাবি অনুযায়ী, সেই অভিজ্ঞতা এতটাই বাস্তব ছিল যে সাধারণ জীবনের অনুভূতিকেও অনেক সময় তার তুলনায় কম বাস্তব বলে মনে হয়েছে।
ইনগ্রিডের বক্তব্য, তিনি তিনটি আলাদা সময়ে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। প্রথমবার মাত্র দু’বছর বয়সে, যখন কলম্বিয়ার বোগোটায় নিজের বাড়ির বরফঠান্ডা জলের ট্যাঙ্কে পড়ে যান। দ্বিতীয়বার ২৫ বছর বয়সে একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এবং তৃতীয়বার ৫২ বছর বয়সে অস্ত্রোপচারের সময় হঠাৎ রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে নেমে গেলে তিনি একই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যান বলে দাবি করেন।
তাঁর কথায়, প্রতিবার মৃত্যুর কিনারে পৌঁছে তিনি যেন পার্থিব জগতের বাইরের এক গভীর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। সেই অবস্থায় তাঁর মনে হয়েছে, মানুষের চেতনা শুধু শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা অনেক বেশি বিস্তৃত এবং একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। তিনি মনে করেন, মানুষের অস্তিত্ব শুধুমাত্র শারীরিক জীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
ইনগ্রিড আরও দাবি করেছেন, সেই অভিজ্ঞতায় তিনি নিজেকে যেন “বিশুদ্ধ সচেতনতা”-র অবস্থায় অনুভব করেছিলেন। সেখানে কোনও ভাষা ছিল না, কিন্তু সবকিছু বোঝা যাচ্ছিল। কোনও দৃশ্যমান সীমারেখা ছিল না, তবু এক অদ্ভুত প্রশান্তি এবং আলোর অনুভূতি তাঁকে ঘিরে রেখেছিল। তাঁর মতে, এটি কোনও স্বপ্ন বা সাময়িক বিভ্রম ছিল না, বরং এক ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা, যা তিন বারই প্রায় একইভাবে ফিরে এসেছিল।
এই অভিজ্ঞতার পরে জীবন সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও সম্পূর্ণ বদলে যায় বলে জানান ইনগ্রিড। আগে তিনি জীবনকে শুধুই সংগ্রাম, সাফল্য এবং টিকে থাকার লড়াই হিসেবে দেখতেন। কিন্তু এখন তাঁর বিশ্বাস, মানুষের চেতনা অনেক গভীর এবং মৃত্যু সেই চেতনার সমাপ্তি নয়, বরং এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তর।
তবে বিজ্ঞানীদের একাংশ এই ধরনের অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা অন্যভাবে দেন। তাঁদের মতে, মৃত্যুর কাছাকাছি অবস্থায় মস্তিষ্কে রাসায়নিক ও স্নায়বিক পরিবর্তনের কারণে আলো দেখা, শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন অনুভূতি বা গভীর শান্তির অনুভব হতে পারে। অনেক গবেষক একে “Near-Death Experience” বা মৃত্যুর কাছাকাছি অভিজ্ঞতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু ইনগ্রিড মনে করেন, তাঁর অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং চেতনার আরও গভীর স্তরের ইঙ্গিত বহন করে।
তিনি এখন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, মৃত্যু কোনও চূড়ান্ত শেষ নয়। বরং এটি এক ধরনের পরিবর্তন, যেখানে চেতনা অন্য রূপে নিজের যাত্রা চালিয়ে যায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষের অস্তিত্বের প্রকৃত রহস্য এখনও পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয়নি।
নিজের এই অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি নিয়ে তিনি “Brightly Guided Life” শিরোনামে একটি বইও লিখেছেন। বইটিতে তিনি জীবনের উদ্দেশ্য, চেতনার প্রকৃতি এবং মৃত্যুর পরে সম্ভাব্য অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এছাড়াও তাঁর আরেকটি আলোচিত বই “Dying to See the Light: A Scientist’s Guide to Reawakening”-এও তিনি মৃত্যুর কাছাকাছি অভিজ্ঞতা এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধি নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন।
ইনগ্রিড হনকালার বৈজ্ঞানিক পরিচয়ও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সমুদ্রবিজ্ঞান এবং পরিবেশগত গবেষণার সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। নাসা এবং মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথ গবেষণাতেও কাজ করেছেন তিনি। ফলে তাঁর এই দাবি অনেকের মধ্যেই কৌতূহল তৈরি করেছে। কেউ তাঁর অভিজ্ঞতাকে আধ্যাত্মিক উপলব্ধি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে মানব মস্তিষ্কের জটিল প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ব্যাখ্যা করছেন।
তবে বিতর্ক যাই থাকুক, ইনগ্রিডের অভিজ্ঞতা আবারও সেই পুরনো প্রশ্নটিকেই সামনে এনে দিয়েছে— মৃত্যু কি সত্যিই শেষ, নাকি অজানা আরেক যাত্রার শুরু?

0 Comments