চরৈবেতি’ হবে আমার মন্ত্র— মুখ্যমন্ত্রী পদে নাম ঘোষণার পর শুভেন্দুর সঙ্কল্প, কেন্দ্র-রাজ্যের যৌথ কাজে বাংলায় মোদীর স্বপ্নপূরণের বার্তা

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে— এমনই বার্তা দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রী পদে তাঁর নাম ঘোষণা হওয়ার পর প্রথম ভাষণেই তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তাঁর পথচলার মূল মন্ত্র হবে— “চরৈবেতি”। সংস্কৃত এই শব্দের অর্থ, এগিয়ে চলা। শুভেন্দুর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বামী বিবেকানন্দের এই অনুপ্রেরণামূলক মন্ত্রকে সামনে রেখেই তিনি আগামী দিনে বাংলার মানুষের জন্য কাজ করতে চান।

ছবি:  এ .আই দ্বারা প্রণীত

শুভেন্দু বলেন, নতুন বিজেপি সরকার কথার থেকে কাজে বেশি গুরুত্ব দেবে। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বাংলার মানুষকে যে যে প্রতিশ্রুতি বা ‘গ্যারান্টি’ দিয়েছেন, তা পূরণ করাই হবে নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তিনি বারবার জোর দিয়ে বলেন, এই সরকার “আমি” নয়, “আমরা” নীতিতে চলবে। অর্থাৎ একক নেতৃত্বের বদলে সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সংগঠনের শক্তি এবং মানুষের অংশগ্রহণকেই তিনি অগ্রাধিকার দিতে চান।

শুক্রবার নিউ টাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে বিজেপির ২০৭ জন জয়ী প্রার্থীর সঙ্গে বৈঠক হয়। সেই বৈঠকেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শুভেন্দু অধিকারীকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে বেছে নেন। এরপর মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রথম ভাষণ দেন শুভেন্দু। ভাষণের শুরুতেই তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বকে ধন্যবাদ জানান।

শুভেন্দুর কথায়, বিজেপির জয় কোনও একক ব্যক্তির কৃতিত্ব নয়। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদী বাংলার মানুষকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, মোদী মানুষকে ভয় কাটিয়ে ভরসার পথে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন। শুভেন্দু আরও বলেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপির সংগঠন, রাজ্য নেতৃত্ব এবং দেশজুড়ে বিজেপি কর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই এই সাফল্য এসেছে।

নিজের বক্তব্যে শুভেন্দু অমিত শাহের দেওয়া কয়েকটি সঙ্কল্পের কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, সন্দেশখালি থেকে আরজি কর— যেখানে যেখানে মা, বোন ও কন্যাদের ওপর অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছে, সেই ঘটনাগুলি নিয়ে কমিশন গঠন করা হবে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি নিয়েও তিনি কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি অর্থের অপব্যবহার বা নয়ছয়ের অভিযোগ যেখানে আছে, সেখানেও তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বিবেচনা করা হবে।

শুভেন্দু বলেন, এই সঙ্কল্প পূরণ করা হবে মন্ত্রিসভা, বিধায়ক দল, বিজেপি সরকার, বিচারধারার সঙ্গে যুক্ত মানুষ এবং বাংলার সাংস্কৃতিক চেতনা সম্পন্ন নাগরিকদের সঙ্গে নিয়ে। তাঁর কথায়, এই পথচলার একটাই মন্ত্র— “চরৈবেতি, চরৈবেতি, চরৈবেতি”।

ভাষণে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন শুভেন্দু। নির্বাচনী প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ বারবার বলেছিলেন, রাজ্যে বিজেপি সরকার এলে কেন্দ্র ও রাজ্য একসঙ্গে কাজ করবে। শুভেন্দু সেই কথাই মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, এবার কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার মিলেমিশে বাংলার উন্নয়নের জন্য কাজ করবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানের মতো বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলি যেমন কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ের সুবিধা পায়, বাংলাকেও সেই পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, মোদীর মন্ত্র— “সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস, সবকা প্রয়াস”— এই ভাবনাকে সামনে রেখেই বাংলাকে নবনির্মাণের পথে এগিয়ে নিতে হবে। বাংলার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা এবং রাজ্যকে নতুন উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়াই হবে নতুন সরকারের লক্ষ্য।

শুভেন্দু আরও জানান, বিজেপি বাংলার মানুষের ভয় কাটাতে পেরেছে। তাঁর মতে, মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে এবং সেই রায়ের মর্যাদা রাখাই এখন তাঁদের দায়িত্ব। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত পংক্তি “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির” উদ্ধৃত করে বলেন, বাংলার মানুষকে ভয়মুক্ত পরিবেশ দিতে হবে। ভয়কে জয় করেই রাজ্যের মানুষের আশা ও ভরসা অর্জন করতে হবে।

তাঁর বক্তব্যে ভোটের অঙ্কও উঠে আসে। শুভেন্দু জানান, চলতি নির্বাচনে বাংলার ৪৬ শতাংশ মানুষ বিজেপিকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু আগামী দিনে ইতিবাচক কাজের মাধ্যমে, সঙ্কল্পপত্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে এবং মোদীর স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে কাজ করে সেই সমর্থন ৬০ শতাংশের বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। বিশেষ করে মা-বোনদের আস্থা অর্জন করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

শুভেন্দু বলেন, বাংলাকে “সোনার বাংলা” হিসেবে গড়ে তোলাই হবে তাঁদের লক্ষ্য। তবে এই কাজ তিনি একা করতে চান না। তাঁর বক্তব্য, “কথা কম, কাজ বেশি”— এই নীতিতে সকলকে সঙ্গে নিয়েই সরকার এগিয়ে যাবে। তিনি বারবার বলেন, “আমি নয়, আমরা”— অর্থাৎ দল, সরকার, কর্মী ও সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়েই উন্নয়নের পথ তৈরি হবে।

ভাষণের একটি বড় অংশে তিনি বিজেপির অতীত ও বর্তমান নেতৃত্বের কথা স্মরণ করেন। তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী প্রণবানন্দকে স্মরণ করেন। পাশাপাশি বাংলায় বিজেপিকে শক্ত অবস্থানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য হরিপদ ভারতী, সত্যব্রত মুখার্জি, সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, অসীম ঘোষ, রাহুল সিংহ, দিলীপ ঘোষ, তথাগত রায়, সুকান্ত মজুমদার এবং শমীক ভট্টাচার্যের নামও উল্লেখ করেন।

শুভেন্দু বিজেপির সেই কর্মীদের কথাও স্মরণ করেন, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, বহু বিজেপি কর্মী অত্যাচারিত, ঘরছাড়া এবং মিথ্যা মামলায় জড়িত হয়েছেন। তাঁদের স্বপ্ন পূরণের কাজ আগামী দিনে বিজেপি সরকার করবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

শনিবার সকালে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শুভেন্দু অধিকারীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।

সারসংক্ষেপে, শুভেন্দু অধিকারী একটি অত্যন্ত স্পষ্ট বক্তব্য রেখেছেন। এই নতুন সরকারের বিষয়ে বলতে গেলে, তাঁরা প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের জন্য সাধ্যমত সবকিছু করতে চান; দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন; কেন্দ্রের সঙ্গে মিলে একটি নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করবেন এবং মোদীর প্রতিষ্ঠিত পরিকল্পনার ভিত্তিতে বাংলাকে পুনর্গঠনের পথে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করবেন। তাঁর ভাষণ অনুসারে, এগিয়ে যাওয়ার একটিই পথ রয়েছে এবং তা হলো অবিরাম, আর সেটি হলো "চরৈবেতি" এবং এটি মানুষকে জীবনে অবিরাম এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

Post a Comment

0 Comments