ভারতে প্রথমবার ধরা পড়ল ‘জেহাদি ড্রাগ’! কী এই ক্যাপটাগন, কেন এত ভয় পাচ্ছে গোটা বিশ্ব ?

ভারতে প্রথমবার এমন এক মাদকের হদিশ মিলেছে, যাকে ঘিরে বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক মহলে আতঙ্ক ছড়িয়ে রয়েছে। এই মাদকের নাম ক্যাপটাগন। 

ছবি : এ . আই দ্বারা প্রণীত

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তদন্তে বহুবার এই ড্রাগের সঙ্গে যুদ্ধ, জঙ্গি কার্যকলাপ এবং অবৈধ অস্ত্র পাচারের যোগের অভিযোগ উঠেছে। আর এবার সেই ক্যাপটাগনই ভারতে বাজেয়াপ্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Amit Shah।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। কারণ সাধারণ মাদক নয়, ক্যাপটাগনকে অনেক সময় আন্তর্জাতিক মহলে “জেহাদি ড্রাগ” বলেও উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ, এই ড্রাগ এমনভাবে মানুষের মস্তিষ্ক ও শরীরে প্রভাব ফেলে যে, ব্যবহারকারী দীর্ঘ সময় জেগে থাকতে পারে, ভয় কম অনুভব করে এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেও অস্বাভাবিক আগ্রাসী আচরণ করতে শুরু করে।

১৮২ কোটি টাকার মাদক উদ্ধার
কী এই ক্যাপটাগন?
কেন একে ‘জেহাদি ড্রাগ’ বলা হয়?
কীভাবে কাজ করে এই ড্রাগ?
আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের বড় অস্ত্র
ভারতে প্রথমবার ধরা পড়ায় বাড়ছে উদ্বেগ
মাদকবিরোধী লড়াই আরও কঠিন
কেন এই ঘটনা এত গুরুত্বপূর্ণ?

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, “অপারেশন রেডপিল” নামে বিশেষ অভিযানে এই বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করেছে Narcotics Control Bureau বা এনসিবি। উদ্ধার হওয়া মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৮২ কোটি টাকা। এই অভিযানে এক বিদেশি নাগরিককেও গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

অমিত শাহ বলেন, ভারতকে মাদকমুক্ত করতে কেন্দ্র সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ভারতকে কোনওভাবেই আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। দেশের ভেতরে কিংবা দেশের মাধ্যমে মাদক পাচারের যেকোনও প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ক্যাপটাগন আসলে একটি সিন্থেটিক বা কৃত্রিম উদ্দীপক ড্রাগ। এটি মূলত ফেনেথাইলিন নামের এক ধরনের রাসায়নিক যৌগের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। ষাটের দশকে এটি চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করা হত। বিশেষ করে মনোযোগের ঘাটতি, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা কিছু মানসিক সমস্যার চিকিৎসায় এই ওষুধ ব্যবহারের অনুমতি ছিল।

কিন্তু ধীরে ধীরে দেখা যায়, এই ওষুধে প্রবল আসক্তি তৈরি হয়। অতিরিক্ত ব্যবহারে মানুষের আচরণে বড় পরিবর্তন আসতে থাকে। ফলে আশির দশকে বিশ্বের বহু দেশ এই ড্রাগ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

গত এক দশকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে উদ্ধার হওয়া সামগ্রী এবং আন্তর্জাতিক তদন্তে বারবার উঠে এসেছে ক্যাপটাগনের নাম। অভিযোগ, কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের সদস্যরা এই মাদক ব্যবহার করত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ড্রাগ ব্যবহার করলে দীর্ঘ সময় ঘুম না হলেও শরীর সচল থাকে। ভয়, ক্লান্তি বা মানসিক চাপ সাময়িকভাবে কমে যায়। একইসঙ্গে বাড়ে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা এবং অস্বাভাবিক আগ্রাসন। ফলে যুদ্ধক্ষেত্র বা হিংসাত্মক পরিস্থিতিতে কিছু মানুষ এটিকে ব্যবহার করত বলে আন্তর্জাতিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কোনও ধর্মের সঙ্গে এই ড্রাগের সরাসরি সম্পর্ক নেই। “জেহাদি ড্রাগ” শব্দটি মূলত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও তদন্ত রিপোর্টে ব্যবহৃত একটি বিতর্কিত জনপ্রিয় নাম, কারণ কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর কাছে এই মাদক পাওয়া গিয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল।

ক্যাপটাগন শরীরে প্রবেশ করার পর মস্তিষ্কে উদ্দীপনা বাড়িয়ে দেয়। এতে ব্যবহারকারী সাময়িকভাবে অতিরিক্ত শক্তি অনুভব করতে পারে। অনেক সময় ক্ষুধা কমে যায়, ঘুম কম লাগে এবং দীর্ঘক্ষণ কাজ করার ক্ষমতা তৈরি হয়েছে বলে মনে হয়।

কিন্তু এর বিপদও ভয়ঙ্কর। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। বাড়তে পারে হিংস্রতা, বিভ্রম, উদ্বেগ, হৃদরোগের ঝুঁকি এবং মারাত্মক আসক্তি। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারী বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যে পার্থক্য হারিয়ে ফেলতে পারেন।

বিশ্বের বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা বহুবার জানিয়েছে, ক্যাপটাগন পাচার এখন একটি বড় আন্তর্জাতিক অপরাধ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে এই মাদকের উৎপাদন ও পাচার থেকে বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগ রয়েছে। সেই অর্থ পরে অস্ত্র কেনা, অবৈধ নেটওয়ার্ক চালানো কিংবা সংঘর্ষমূলক কার্যকলাপে ব্যবহার করা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যাপটাগন শুধু একটি মাদক নয়, বরং এটি এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে।

ভারতে এই প্রথম এত বড় পরিমাণ ক্যাপটাগন উদ্ধার হওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে নিরাপত্তা মহলে। কারণ এতদিন এই মাদক নিয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল মূলত মধ্যপ্রাচ্য বা আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের মধ্যেই। কিন্তু এবার ভারতে এর হদিশ মেলায় প্রশ্ন উঠছে—দেশ কি আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের নতুন টার্গেটে পরিণত হচ্ছে?

তদন্তকারী সংস্থাগুলি এখন খতিয়ে দেখছে, এই মাদক কোথা থেকে ভারতে আনা হয়েছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং এর চূড়ান্ত গন্তব্য কোথায় ছিল। এছাড়া আন্তর্জাতিক কোনও চক্রের সঙ্গে এর যোগ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে মাদক পাচারের ধরন অনেকটাই বদলে গিয়েছে। আগে সীমান্ত বা সমুদ্রপথে পাচারের ঘটনা বেশি দেখা গেলেও এখন প্রযুক্তি, গোপন নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই ব্যবসা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

ভারতের মতো বড় দেশে তরুণ সমাজকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন ধরনের সিন্থেটিক ড্রাগ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা বাড়ছে বলেও সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, সাধারণ মানুষকেও সচেতন হওয়া জরুরি।

এই উদ্ধার শুধু একটি মাদক চক্র ভাঙার ঘটনা নয়। বরং এটি দেখিয়ে দিল, আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র এখন কতটা সক্রিয় এবং তাদের জাল কত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ক্যাপটাগনের মতো বিপজ্জনক মাদক ভারতে পৌঁছে যাওয়া মানে নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়া।

সব মিলিয়ে, “জেহাদি ড্রাগ” নামে পরিচিত ক্যাপটাগন উদ্ধার ঘিরে এখন গোটা দেশে তীব্র আলোচনা চলছে। একদিকে যেমন মাদক পাচার রুখতে বড় সাফল্যের দাবি করছে সরকার, অন্যদিকে তেমনি এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের প্রভাব নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। তদন্ত যত এগোবে, ততই সামনে আসতে পারে আরও বিস্ফোরক তথ্য।

Post a Comment

0 Comments