কলকাতা পুরসভায় তীব্র সংঘাত: সচিবকে হেনস্থার অভিযোগে পুলিশি তলব মেয়র পারিষদ বৈশ্বানরকে !

নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা: রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের আবহেই এবার তুমুল উত্তেজনা ছড়াল কলকাতা পুরসভায় (KMC)। 

ছবি : এ . আই দ্বারা প্রণীত


পুরসভার সচিবকে হেনস্থা এবং তাঁর ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টির অভিযোগে শাসকদলের হেভিওয়েট নেতা তথা মেয়র পারিষদ বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়কে তলব করল পুলিশ। নিউ মার্কেট থানার এই পদক্ষেপের পর পুরভবনের অন্দরে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক টানাপড়েন এক নতুন মাত্রা নিয়েছে।

পুরবোর্ডে এখনও তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকলেও, প্রশাসনের ওপর তাদের রাশ যে অনেকটাই আলগা হচ্ছে, এই ঘটনা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। ঠিক কী ঘটেছিল পুরসভায়? কেন এই সংঘাত ? বিস্তারিত জেনে নিন নিচে পয়েন্ট আকারে :

১. ঘটনার সূত্রপাত কীভাবে?

বিতর্কের আসল কারণ হলো কলকাতা পুরসভার নির্ধারিত একটি অধিবেশন বাতিল হওয়া। গত শুক্রবার পুরসভার একটি সাধারণ অধিবেশন বসার কথা ছিল। কিন্তু তার আগের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার আচমকাই পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে সেই অধিবেশন বাতিল বলে ঘোষণা করেন। প্রশাসনের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় ঘাসফুল শিবিরের কাউন্সিলরদের মধ্যে।

২. কাউন্সিলরদের বিক্ষোভ ও সচিবের ঘরে হানা

অধিবেশন বাতিলের প্রতিবাদে শুক্রবার দুপুরেই পুরসভার কাউন্সিলর ক্লাবে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন তৃণমূল কাউন্সিলরেরা। তাঁদের সাফ দাবি ছিল, পূর্বনির্ধারিত সূচি মেনেই অধিবেশন করতে হবে এবং তার জন্য বন্ধ থাকা কাউন্সিল চেম্বার অবিলম্বে খুলে দিতে হবে। এই দাবি নিয়ে মেয়র পারিষদ বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একদল কাউন্সিলর সরাসরি পুরসভার সচিব কিশোরকুমার বিশ্বাসের ঘরে গিয়ে চড়াও হন।

৩. হেনস্থার অভিযোগ ও থানার এফআইআর (FIR)

পুর প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, সচিবের ঘরে ঢুকে বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর সঙ্গী কাউন্সিলরেরা সচিব কিশোরকুমার বিশ্বাসের ওপর চরম মানসিক চাপ সৃষ্টি করেন এবং তাঁকে হেনস্থা করেন। এই ঘটনার পরই পুর আধিকারিকদের তরফে নিউ মার্কেট থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই রবিবার পুলিশ বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় হাজির হওয়ার নোটিশ পাঠায়।

৪. অভিযুক্ত মেয়র পারিষদের প্রতিক্রিয়া

পুলিশি তলব প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে মেয়র পারিষদ বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন যে, তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং তদন্তের স্বার্থে পুলিশকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। তবে ঠিক কোন দিন তিনি নিউ মার্কেট থানায় হাজিরা দেবেন, তা তিনি স্পষ্ট করে জানাননি।

৫. জোড়া ফলায় বিদ্ধ শাসকদল: গ্রেফতার আর এক নেতা

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসকদলের অস্বস্তি আরও বাড়িয়েছে অন্য একটি ঘটনা। শুক্রবার সচিবের ঘরে বৈশ্বানরের সঙ্গে বোরো-১৬-র চেয়ারম্যান সুদীপ পোল্লেও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু শনিবারই ঠাকুরপুকুর থানার পুলিশ সুদীপ পোল্লের বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ এনে তাঁকে গ্রেফতার করেছে। ফলে একদিকে তোলাবাজির দায়ে নেতার গ্রেফতারি, আর অন্যদিকে মেয়র পারিষদকে পুলিশি তলব— সব মিলিয়ে জোর ধাক্কা খেয়েছে শাসক শিবির।

৬. সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখছে পুলিশ

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার দিন বৈশ্বানর ও সুদীপ ছাড়াও আরও চারজন কাউন্সিলর সচিবের ঘরে গিয়েছিলেন। তদন্তের প্রয়োজনে সেই বাকি চার কাউন্সিলরকেও খুব শীঘ্রই ডেকে পাঠাতে পারে পুলিশ। ইতিমধ্যেই ঘটনার দিন সচিবের ঘরের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সেখানে উপস্থিত থাকা অন্যান্য সরকারি কর্মীদের বয়ান রেকর্ড করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে নিউ মার্কেট থানার পুলিশ।

রাজনৈতিক মহলের বিশ্লেষণ

৪ মে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক সমীকরণে বড়সড় বদল লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা কেবলই একটি প্রশাসনিক সংঘাত নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক লড়াই। আগামী দিনে এই পুর-সংঘাত রাজ্যের রাজনীতিতে আরও বড় কোনো বিতর্কের জন্ম দেয় কি না, এখন সেটাই দেখার।

Post a Comment

0 Comments