কলকাতার অন্যতম প্রাচীন ও পরিচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান Surendranath College এবার উঠে এল বড়সড় আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে। ছাত্র সংসদের তহবিলে কোটি কোটি টাকা জমা পড়া এবং সেই টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
![]() |
| ছবি : এ . আই দ্বারা প্রণীত |
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরব হয়েছেন বরানগরের বিজেপি বিধায়ক Sajal Ghosh। তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী Suvendu Adhikari-র কাছে তদন্তের দাবি জানিয়ে তথ্য-প্রমাণ পাঠিয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত একটি ব্যাঙ্ক পাসবইয়ের তথ্য ঘিরে। সেই তথ্য সামনে এনে সজল ঘোষ দাবি করেন, কলেজের ছাত্র সংসদের তহবিলে অস্বাভাবিক পরিমাণ টাকা জমা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, সাধারণত ছাত্র সংসদের জন্য ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে বছরে ৫০ থেকে ১০০ টাকার মতো নেওয়া হয়। সেই টাকা থেকে কখনও বছরে আড়াই কোটি বা তারও বেশি টাকা তহবিলে জমা হওয়া স্বাভাবিক নয়। আর এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন—এই বিপুল পরিমাণ টাকা এল কোথা থেকে?
বিধায়কের অভিযোগ অনুযায়ী, বহু বছর ধরে কলেজে “লক্ষ্য” নামে একটি অনুষ্ঠান হয়ে আসছে। বাইরে থেকে সেটিকে সাংস্কৃতিক বা সামাজিক অনুষ্ঠান হিসেবে দেখানো হলেও, বাস্তবে সেটি ছিল টাকা তোলার একটি বড় মাধ্যম। যদিও তিনি কারও নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি, তবুও তাঁর অভিযোগের তির ছিল কলেজের প্রভাবশালী এক কর্তার দিকে। মধ্য কলকাতায় যিনি “কানকাটা দেবু” নামে পরিচিত বলেও দাবি করেন সজল।
সজল ঘোষ আরও বলেন, ছাত্র রাজনীতি নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বহু বছর ধরেই কলেজে ছাত্র সংসদ পরিচালনা করেছে। কিন্তু অতীতে কখনও ছাত্র সংসদের নামে এত বিপুল টাকা ঘোরাফেরা করেনি। তাই বিষয়টি শুধুমাত্র কলেজের অভ্যন্তরীণ আর্থিক লেনদেন নয়, বরং এর পেছনে আরও বড় কোনও চক্র কাজ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, বর্তমানে সেই তহবিলে এখনও এক কোটি টাকারও বেশি অর্থ রয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, ছাত্র সংসদের মতো একটি সংগঠনের অ্যাকাউন্টে এত বিপুল পরিমাণ টাকা কেন থাকবে? কে বা কারা সেই টাকা দিয়েছে? কলেজ কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল? এই সমস্ত বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলেই দাবি তুলেছেন তিনি।
বিজেপির তরফে আরও গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। দলের দাবি, কলেজে ভর্তির সময় বহু ছাত্রছাত্রীর কাছ থেকে অফ দ্য রেকর্ড টাকা তোলা হত। সেই অর্থের বড় অংশ ছাত্র সংসদের তহবিলে জমা পড়ত। অভিযোগ, এই গোটা প্রক্রিয়ার সঙ্গে কলেজের শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মী এবং ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একাংশের যোগ থাকতে পারে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা এখনও সরকারি ভাবে প্রমাণিত হয়নি, তবুও বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট উত্তেজনা তৈরি হয়েছে শিক্ষামহলে।
এই ঘটনার পর সোশ্যাল মিডিয়াতেও শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। সজল ঘোষের পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর বহু বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী কলেজের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেন। কেউ অভিযোগ করেছেন অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার, কেউ আবার দাবি করেছেন কলেজে দীর্ঘদিন ধরেই কিছু বিষয় নিয়ে অসন্তোষ ছিল। যদিও সব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়নি, তবুও একের পর এক মন্তব্য সামনে আসায় বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এমন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। তবে সুরেন্দ্রনাথ কলেজের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের নাম জড়িয়ে পড়ায় অনেকেই হতাশ। কারণ এই কলেজ শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বহু বছরের ইতিহাস ও ছাত্র আন্দোলনের সাক্ষী। তাই এমন প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়ায় উদ্বেগ বাড়ছে ছাত্র-অভিভাবকদের মধ্যেও।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ অভিযোগ সত্যি হলে তা শুধুমাত্র আর্থিক দুর্নীতি নয়, বরং ছাত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলাও বটে। ছাত্র সংসদের নামে যদি বেআইনি টাকা তোলা হয়ে থাকে, তাহলে তার দায় এড়ানো সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, শাসকদলের তরফে এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিষয়টি এখন শুধু কলেজের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। কারণ ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অর্থের লেনদেন—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ায় ঘটনাটি বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, বর্তমানে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। ছাত্র সংসদের নামে বিভিন্ন খাতে টাকা তোলা হলেও, সেই টাকার পূর্ণাঙ্গ হিসাব সবসময় প্রকাশ করা হয় না। ফলে কোথাও কোথাও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। তাই ভবিষ্যতে এই ধরনের বিতর্ক এড়াতে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আর্থিক অডিট আরও কঠোর হওয়া দরকার।
এদিকে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের একাংশও চাইছেন, এই ঘটনায় দ্রুত সত্য সামনে আসুক। কারণ অভিযোগ মিথ্যা হলে তা পরিষ্কার হওয়া জরুরি, আর অভিযোগ সত্যি হলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, সুরেন্দ্রনাথ কলেজকে ঘিরে এই বিস্ফোরক অভিযোগ এখন রাজ্যের শিক্ষা ও রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। কোটি কোটি টাকার উৎস, ছাত্র সংসদের ভূমিকা, কলেজ প্রশাসনের দায়িত্ব এবং সম্ভাব্য দুর্নীতির চক্র—সবকিছু নিয়েই এখন প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠছে। তদন্ত হলে তবেই সামনে আসবে আসল সত্য। তবে এই ঘটনা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসে গিয়েছে।

0 Comments