চিন সফরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা! মোবাইল ছাড়াই গিয়েছিলেন ট্রাম্পের সঙ্গীরা, ফেরার আগে নষ্ট করা হল ফোনও

বিশ্ব রাজনীতির দুই শক্তিশালী দেশ আমেরিকা ও চিনের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। বাণিজ্য যুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি, গুপ্তচরবৃত্তি—প্রায় সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র। আর সেই কারণেই যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump চিন সফরে যান, তখন তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থা যে অন্য মাত্রায় পৌঁছাবে, তা অনুমান করাই যায়।

ছবি : এ . আই দ্বারা প্রণীত

সম্প্রতি প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্পের চিন সফরে তাঁর সঙ্গে যাওয়া মার্কিন প্রতিনিধিদের উপর এমন কঠোর সাইবার নিরাপত্তা বিধি চাপানো হয়েছিল, যা সাধারণ কূটনৈতিক সফরের তুলনায় অনেক বেশি কড়া। শুধু তাই নয়, চিন থেকে পাওয়া উপহার পর্যন্ত তাঁরা দেশে ফেরার আগে ফেলে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি সফরে ব্যবহৃত ফোনও ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা—আধুনিক বিশ্বে সাইবার গুপ্তচরবৃত্তি ঠিক কতটা বড় হুমকি হয়ে উঠেছে?

ব্যক্তিগত মোবাইল বা ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়ার অনুমতি ছিল না

রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্রাম্পের সঙ্গে আমেরিকা থেকে যাঁরা চিন সফরে গিয়েছিলেন, তাঁদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা অন্য কোনও ইলেকট্রনিক ডিভাইস সঙ্গে নিতে নিষেধ করা হয়েছিল। সফরের আগেই সব ডিভাইস আমেরিকায় রেখে যেতে বলা হয়।

কারণ, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলির আশঙ্কা ছিল—এই ডিভাইসগুলি হ্যাক হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। শুধু তথ্য চুরি নয়, ডিভাইসের মধ্যে গোপনে ক্ষতিকর সফটওয়্যার ঢুকিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক সাইবার হামলা এতটাই উন্নত পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একজন ব্যবহারকারী বুঝতেই পারেন না কখন তাঁর ডিভাইসে নজরদারি শুরু হয়েছে।

কী এই ‘বার্নার ফোন’?

চিন সফরে যাওয়া মার্কিন প্রতিনিধিদের প্রত্যেকের হাতে দেওয়া হয়েছিল তথাকথিত “বার্নার ফোন”। এই ধরনের ফোন সাধারণ স্মার্টফোনের মতো নয়। এগুলি তুলনামূলকভাবে সস্তা, অস্থায়ী এবং সীমিত ফিচারযুক্ত ডিভাইস।

মূল উদ্দেশ্য হল, যদি ফোন হ্যাকও হয়, তাহলেও গুরুত্বপূর্ণ কোনও তথ্য যেন শত্রুপক্ষের হাতে না যায়।

এই ফোনে সাধারণত ব্যক্তিগত ছবি, সরকারি নথি, ইমেল, গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ বা সংবেদনশীল তথ্য রাখা হয় না। ফলে ডিভাইসটি নজরদারির শিকার হলেও ক্ষতির পরিমাণ কম হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সফরে এখন বহু দেশই এই ধরনের ফোন ব্যবহার করে। বিশেষ করে যেসব দেশে সাইবার নজরদারির অভিযোগ বেশি, সেখানে এই ব্যবস্থা আরও কঠোর হয়।

সফর শেষে ফোন ধ্বংস !

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হল, চিন সফর শেষে আমেরিকায় ফেরার আগে সেই বার্নার ফোনগুলিও নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। কারণ গোয়েন্দা সংস্থাগুলির আশঙ্কা ছিল, ফোনের ভেতরে অদৃশ্যভাবে কোনও ট্র্যাকিং সিস্টেম বা ম্যালওয়্যার ঢুকে যেতে পারে।

এমনকি ফোন বন্ধ থাকলেও অনেক সময় ডিভাইসকে ব্যবহার করে লোকেশন ট্র্যাকিং বা তথ্য সংগ্রহ সম্ভব বলে দাবি করেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

তাই কোনও ঝুঁকি না নিয়েই সফর শেষে সমস্ত অস্থায়ী ডিভাইস ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।

চিনের দেওয়া উপহারও ফেলে দেওয়া হয় ?

রিপোর্ট অনুযায়ী, চিন সফরের সময় ট্রাম্প ও তাঁর প্রতিনিধি দলের সদস্যদের কিছু স্মারক উপহার দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল ব্যাজ, স্মারকচিহ্ন এবং কিছু আনুষ্ঠানিক উপহার সামগ্রী।

কিন্তু অভিযোগ, বেজিং ছাড়ার আগে সেগুলিও ফেলে দেওয়া হয়। কারণ মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থাগুলির আশঙ্কা ছিল, উপহারের মধ্যে কোনও ধরনের ইলেকট্রনিক নজরদারি ব্যবস্থা বা ট্র্যাকিং প্রযুক্তি লুকিয়ে থাকতে পারে।

যদিও এই অভিযোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও পক্ষ বিস্তারিত মন্তব্য করেনি, তবুও ঘটনাটি ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে।

কেন এত ভয় সাইবার গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে ?

বিশ্ব রাজনীতিতে এখন শুধু সেনা বা অস্ত্রই বড় শক্তি নয়, তথ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনও দেশের রাজনৈতিক পরিকল্পনা, সামরিক কৌশল, কূটনৈতিক আলোচনা বা প্রযুক্তিগত গবেষণার তথ্য হাতিয়ে নেওয়া এখন বড় ধরনের সাইবার যুদ্ধের অংশ হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি মোবাইল ফোন থেকেই একজন ব্যক্তির অবস্থান, যোগাযোগ, নথি, ছবি, এমনকি ব্যক্তিগত অভ্যাস সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব।

তাই আন্তর্জাতিক সফরে বড় নেতাদের নিরাপত্তায় এখন ডিজিটাল সুরক্ষা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুইচ-অফ ফোনও কি বিপজ্জনক ?

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, শুধুমাত্র ফোন বন্ধ করে দিলেই সব ঝুঁকি শেষ হয় না। অনেক সময় ডিভাইসের হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যারের মাধ্যমে নজরদারি চালানো সম্ভব হতে পারে।

এই কারণেই কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সফরে যাওয়ার আগে পুরনো ডিভাইস সম্পূর্ণভাবে বাদ দিয়ে নতুন অস্থায়ী ডিভাইস ব্যবহার করা হয়।

বিশেষ করে যেসব দেশে গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহ রয়েছে, সেখানে এই নিয়ম আরও কঠোর হয়।

আমেরিকা-চিন সম্পর্কের টানাপোড়েন

আমেরিকা ও China-র মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। হুয়াওয়ে বিতর্ক থেকে শুরু করে টিকটক, সাইবার হ্যাকিং, তথ্য চুরি—বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বহুবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের চিন সফরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে খুব একটা অস্বাভাবিক বলে মনে করা হচ্ছে না।

সাধারণ মানুষের জন্যও বড় শিক্ষা

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতির খবর নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও বড় সতর্কবার্তা। কারণ এখন সাধারণ মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপও সাইবার অপরাধীদের লক্ষ্য হতে পারে।

অচেনা লিঙ্কে ক্লিক করা, অজানা ডিভাইস ব্যবহার করা, অপরিচিত ইউএসবি বা সফটওয়্যার ব্যবহার—এসব থেকেই বড় বিপদ তৈরি হতে পারে।

তাই ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখতে এখন সবাইকেই আরও সতর্ক হতে হবে।

আধুনিক যুগে যুদ্ধের নতুন রূপ

একসময় যুদ্ধ মানেই ছিল বন্দুক, ট্যাঙ্ক বা মিসাইল। কিন্তু এখন তথ্য ও প্রযুক্তিই সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠছে। একটি ফোন, একটি ল্যাপটপ কিংবা একটি ছোট চিপ থেকেই ফাঁস হয়ে যেতে পারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

ট্রাম্পের চিন সফরের এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাই শুধু একটি কূটনৈতিক সফরের গল্প নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের বদলে যাওয়া নিরাপত্তা বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

সব মিলিয়ে, চিন সফরে মার্কিন প্রতিনিধিদের মোবাইল না নেওয়া, বার্নার ফোন ব্যবহার করা, সফর শেষে সেগুলি ধ্বংস করা এবং উপহার পর্যন্ত ফেলে দেওয়ার ঘটনা এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়। এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে—বর্তমান বিশ্বে সাইবার নিরাপত্তা আর বিলাসিতা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম বড় অংশ হয়ে উঠেছে।



Post a Comment

0 Comments